কৃষকের ছেলে থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একজন রকিবুল হাসান

কৃষকের ছেলে থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একজন রকিবুল হাসান

যার সততা প্রশ্নবিদ্ধ নয়। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে যে মানুষটির জুড়ি মেলা ভার। তিনি হলেন, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: রকিবুল হাসান । গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে তিনি এ উপজেলায় যোগদান করেন। যোগদানের পর গত ৬ মাসে তিনি ১২০টির বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মিরপুর উপজেলার সমাজ বিরোধিদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন এক আতঙ্কিত নামে।

রকিবুল হাসানের জন্ম ১২ মার্চ,১৯৮৬/১৯৮৭সালে, গ্রামের এক কৃষক পরিবারে। শৈশব কেটেছে গ্রামের মুক্ত আলো বাতাসে। কৈশরের দুরন্তপনার সময়টার বেশিরভাগি কেটেছে সময়জ্ঞান ভুলে, ক্রিকেট খেলে আর রঙিন ঘুড়ি উড়িয়ে। জন্মটা প্রায় লেখাপড়াহীন কৃষক পরিবারে হওয়ায়, বড় কিছু হওয়ার চিন্তা কখনোই তাকে পিছু তাড়িয়ে বেড়ায়নি।

প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকদের কাছে খুবই আদরের ছিলেন তিনি; তাই ব্রহ্মকপালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি সফলভাবে পাশ করায় তখনকার প্রধান শিক্ষক শামীমা সুলতানা ও সহকারি শিক্ষক মোঃ সানোয়ার হোসেন এই দুইজন মিলে তার দাদার দেওয়া নাম ‘ মোঃ হানজালা আকন্দ’ কে বদলিয়ে “মোঃ রকিবুল হাসান “তার সার্টিফিকেটে অন্তর্ভুক্ত করেন। সেই থেকে তিনি ‘রকিব’ নামে পরিচিত হতে শুরু করেন।

পাগলা বোয়ালিয়া হাইস্কুল থেকে ষষ্ঠ শেণী সমাপ্ত করে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন তৎকালীন বিখ্যাত কয়ড়া হাইস্কুলে; সেসময় জায়গীর ছিলেন রাখালগাছা কয়রায়; হাজ্বী শামসুজ্জোহার বড় মেয়ে পারভীন সুলতানার স্বামীর বাড়িতে।

তৎকালীন বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটার হাসিবুল হাসান শান্ত এর মত বোলিং এবং আচার আচরণে শান্ত হওয়ায়, কয়ড়া গ্রামে তিনি ‘শান্ত ‘ নামেও পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তৃতীয় পক্ষের কোন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় শামসুজ্জোহা পরিবার ও আকন্দ পরিবারের সম্পর্ক অবনতি হলে,তিনি অষ্টম শ্রেণী শেষ করে আবারো নিজ গ্রামে ফিরে আসেন।

এবার নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন তৎকালীন বিখ্যাত উল্লাপাড়া মার্চেন্টস পাইলট হাইস্কুলে। এ স্কুলে ভর্তি হয়ে তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন যে, তিনি আসলে লেখাপড়ায় অনেক পিছিয়ে।

তার পর থেকে চেষ্টা করতে থাকেন, কেমনে ভালো ফলাফল করা যায়। এ স্কুল থেকে মোটমুটি ভালো ফলাফল নিয়ে এসএসসি পাশ করেন। তার পর আকবর আলী কলেজে ভর্তি পরিক্ষায় তৃতীয় হয়ে সরকারি আকবর আলী কলেজে ভর্তি হন ( তখন কলেজ এ ভর্তি পরিক্ষা দিতে হতো)। এ কলেজ থেকে এইচএসসি পরিক্ষায় মোটামুটি ভালো ফলাফল নিয়ে পাশ করেন।

এইচএসসি পরিক্ষার পর কোচিং করতে হবে, এটা তার জানাই ছিলনা,বিধায় কোচিং করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।
এ সময় হঠাৎ একদিন দেখা হলো শিপন ভাই ( আকবর চাচার একমাত্র ছেলে) এর খালাতো ভাই আরমানুল হক ( যিনি বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক) এর সাথে, তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। তার কাছেই প্রথম শোনা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরিক্ষা এসব বিষয়ে।
তার পর তার কাছে কাগজপত্র দিয়ে দেন আবেদন করার জন্য। বলা যায় কোচিংবিহীন, প্রস্তুতিবিহীন পরিক্ষা দিয়েও আইন বিভাগে ১৮ তম হয়েছিলেন।অবশ্য আরো কতিপয় বিষয়েও নির্বাচিত হয়েছিলেন, এমনকি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২য় হয়েছিলেন।এছাড়াও আরো সুযোগে হয়েছিলো সাংবাদিকতাসহ আরো কিছু বিষয় পড়ার,এমনকি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, কিন্তু কোনটাতেই না গিয়ে শেষমেষ গন্তব্য হলো আইন বিষয়েই।

কিন্তু তিনি সবসময়ই স্বাধীনচেতা ছিলেন, ভালো না লাগলে সে বিষয়গুলো সর্বদাই বাদ দিয়ে দিতেন।
আইন পড়তে গিয়ে দেখলেন বিষয় টি সারা দেশে যে ভাবে প্রাকটিস হয়,তাতে নীতিনৈতিকতা নিয়ে চলাই মুসকিল।।

একান্ত আলাপকালে রকিবুল হাসান বলেন,

বিশেষ করে আমাদের দেশের পেক্ষাপটে।
তাই সবার আপত্তি সত্ত্বেও ছেড়ে দেই আইন পড়া।
এজন্য আমাকে শুনতে হয়েছে হাজারো গঞ্জনা।

এর পর ভেবেছিলাম আর পড়বই না; এভাবে পড়ালেখাহীন কেটেছে, একটা বড় সময়।
একদিন আমার মনে হলো, পড়াশোনা না করেই বা কি করব;তারচেয়ে বরং পড়াশোনা করেই দেখি,কোন পরিবর্তন আনতে পারি কিনা?
এ ভাবনা থেকেই আবারো পড়ার চেষ্টা।

ভর্তি হই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিন প্রাইভেট প্রোগামে ( Break of study হওয়ায় আমি রেগুলার প্রোগামে পড়তে পারিনি), সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে। এখান থেকেই ইংরেজী তে ডিস্টিংশন সহ BSS পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করি।

এরপর পড়েছি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, সে ব্যাচের মধ্যেও আমি মাস্টার্সে প্রথম হই,এর মধ্যে আবার চান্স পেয়ে যাই আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পড়া পুরোটা শেষ না হতেই, ৩৪ বিসিএস এর প্রস্তুতি শুরু করি।

এর মধ্যে, চাকরি পেয়ে যাই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (BADC) ‘ সহকারী সচিব ‘ হিসেবে, এখানেও অবশ্য আমি প্রথম হয়েই চাকরিটি পেয়েছিলাম।

এর পর ৩৪ তম বিসিএস এর ফলাফল বের হয় ;

এখানেও প্রশাসন ক্যাডারে লিখিত পরিক্ষায় সর্বোচ্চদের মধ্যে থাকার পাশাপাশি, প্রোফেশনাল ক্যাডারেও ( সমাজবিজ্ঞান) লিখিত পরীক্ষায় ছিলাম সর্বোচ্চদের মধ্যে।

কিন্তু ভাইভা এর পাশাপাশি বিজ্ঞান বিষয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে কম নম্বর দেওয়ায় শেষমেষ ঠাঁই মেলে প্রশাসন ক্যাডারের ৩৫ তম অবস্থানে ….

জীবনে যাদের কাছে কৃতজ্ঞ তাদের তালিকায় আছেন – বড়ভাই, দাদা,মা – বাবা,বড় মামাতো বোন শিল্পী, শামছুল আলম ভাই, আরমানুল হক, জমির কাকা, সহপাঠী ফিরোজ শাহীন সহ অনেকেই।

ইতোমধ্যেই তাঁর উদ্যোগে তাঁর গ্রামের এক ঝাঁক উদ্যোগী তরুণদের সম্মিলনে নিরন্তর কাজ করে চলেছে ‘The Glowing Patrons’ নামের একটি সংগঠন । সংগঠনটি প্রতিবছর কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা যাচাই প্রতিযোগিতা, একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ গ্রামের প্রতিটি শিশুর বিকাশে একটি খেলার মাঠ প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এছাড়াও সংগঠনটি জরুরি পরিস্থিতিতে (যেমন- সাম্প্রতিক করোনায় কর্মহীনদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ) সংগঠিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি ঈদে সকলের খুশি নিশ্চিত করতে পারিবারিকভাবে অসচ্ছল শিশুদের জন্য ঈদের নতুন পোশাক ও দু:স্থদের জন্য মিষ্টিসামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

সদা উদ্যমী এ কর্মকর্তার ইচ্ছা আছে, দেশের বাহিরে পড়তে যাওয়ার, কাজ করতে চান বৈশ্বিক পরিমন্ডলে; একটু বেশিদিন বেঁচে থাকলে চেষ্টা করবেন দেশের নীতি নির্ধারক হতে। রকিব হাসান তার জীবনটাকে গিফট মনে করেন,ব্যয় করতে চান মানুষের কল্যাণে।তাই কাজ করতে চান গ্রামের জন্য,ছোটদের জন্য, যারা একদিন গ্রামটাকে সম্মানের আসনে সমাসীন করবে।

গ্রামের শেষ ব্যক্তিটি সুখে আছেন, এ কথা শোনার আগ পর্যন্ত যেন মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখেন, এটাই পরম করুনাময়ের কাছে তাঁর অন্তিম ইচ্ছা।

সংবাদটি ফেসবুকে শেয়ার করুন