শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীনে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা অব্যাহত রাখার কিছু বিকল্প প্রস্তাব

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধকালীনে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা অব্যাহত রাখার কিছু বিকল্প প্রস্তাব

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ রয়েছে প্রায় দুই মাস হতে চলল। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা নিয়ে ব্যাপক হতাশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত¡াবধানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনে রেকর্ডকৃত প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেবার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে।

সকল শিক্ষার্থীকে শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত রাখার নিমিত্তে নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে তাদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। চলমান এই সকল উদ্যোগের পাশাপাশি নিম্মোক্ত উদ্যোগসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে।

১. সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি বেসরকারি প্রথম সারির চ্যানেল, যেগুলো দেশের সকল প্রান্ত থেকে দেখা যায়, এমন অন্তত ১০টি টিভি চ্যানেলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে শর্ত হলো রেকর্ডকৃত এই প্রোগ্রামগুলো যেন স্পস্ট দেখা যায় এবং সাউন্ড যেন ভালোভাবে শোনা যায়।

২. অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকরীভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিস্তৃত করতে হলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে মোবাইল কোম্পানীগুলো একদম কমরেটে ইন্টারনেট প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে যাতে করে শিক্ষার্থীদের জন্য তা একেবারে সহজলভ্য হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিটিসিএল এর মাধ্যমে মোবাইল কোম্পানীগুলোর সাথে চুক্তি করে নিতে পারে।

৩. প্রতিটি শ্রেণির জন্য যে নির্ধারিত সিলেবাস রয়েছে তা থেকে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের সাথে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেখে সিলেবাসকে কিছুটা সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে।

৪. শিক্ষাবর্ষকে অন্তত দুই থেকে তিন মাস বাড়িয়ে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত সিলেবাস শেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক/বার্ষিক পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে।

৫. প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষককে শ্রেণিভিত্তিক বিভাজন করে শিক্ষার্থীদের সাথে ভার্চুয়াল পদ্ধতির মাধ্যমে যোগাযোগ করে তাদেরকে শিক্ষা সংক্রান্ত সকল বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। শিক্ষকের কাছ থেকে প্রাপ্ত এই দিকনির্দেশনা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি অধিকতর মনোযোগী করে তুলতে সহায়ক হবে।

৬. প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আইসিটি বিষয়ক শিক্ষকগণ আইসিটি সংক্রান্ত বিষয়ে হেল্পলাইন খুলতে পারেন যাতে করে স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অধিকতর সহজ প্রক্রিয়ায় তাদের অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারে।

৭. কমিউনিটি রেডিও বর্তমান সময়ে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় সকল খবরাখবর আমরা কমিউনিটি রেডিও-এর মাধ্যমে খুব সহজেই দ্রুততর সময়ের মধ্যে জানতে পারি। এই সময়ে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা সম্প্রসারণে কমিউনিটি রেডিও কে কাজে লাগানো যেতে পারে;

৮. ইলেকট্রনিক্র মিডিয়ার পাশাপাশি প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম প্রচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দেশের নামকরা সুখ্যাতি আছে এমন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকগণ নির্ধারিত সিলেবাসভিত্তিক প্রতিটি বিষয়ের উপর প্রিন্ট মিডিয়ায় বিশদভাবে আলোচনা করতে পারেন যাতে করে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট সম্পর্কে একটি সুস্পস্ট ধারণা নিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারে;

৯. শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা/উপহার সামগ্রী/আর্থিক সহযোগিতা ঘোষণা করা যেতে পারে। আর তা হলো যে সকল শিক্ষার্থী আগামী চূড়ান্ত পরীক্ষায় সকল বিষয়ে শতকরা ৬০-৮০ নম্বর পাবে তাদেরকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে। উপজেলাভিত্তিক এমন ঘোষণা আসতে পারে। এই ঘোষণার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিভাবে সামনের ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো করা যায় এমন একটি প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরী হবে। এই ঘোষণাটিও ব্যাপকভাবে প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক্র মিডিয়ায় প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের ক্রান্তিকালীন এই সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার স্বার্থে উপজেলা প্রশাসনের অনুকূলে একটি আলাদা শিক্ষা বরাদ্দ প্রদান করা যেতে পারে।

সর্বোপরি শিক্ষার্থীদেরকে এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কোনভাবেই তাদেরকে পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত হতে দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে অভিভাবকরা পরিবারভিত্তিক সামনের চূড়ান্ত পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলে বিশেষ উপহার সামগ্রী প্রদান করা হবে এই মর্মে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত করতে পারেন। এই সংকটকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার স্বার্থে সকলকেই কিছুটা ছাড় দেবার মানসিকতা থাকতে হবে। সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।

লেখক-

রিসার্চ অফিসার, জেলা শিক্ষা অফিস (মাধ্যমিক)

সংবাদটি ফেসবুকে শেয়ার করুন