শিক্ষা কার্যক্রম চলছে অনলাইনে

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে গত ১৮ মার্চ থেকেই সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বাড়তে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটিও। তবে ছুটির কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এবং তাদের শিক্ষা জীবন যেনো ব্যহত না হয় সেজন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। শুরু থেকেই মাধ্যমিক ও প্রাথমিকের ক্লাস টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হচ্ছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেয়ার জন্য দেয়া হচ্ছে নির্দেশনা। এমনকি ছুটি আরও বেশি দীর্ঘায়িত হলে প্রয়োজনে পরীক্ষা ও ভাইভাও অনলাইনের মাধ্যমে গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে বেসরকরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন অনলাইনে ক্লাস না নেয়ার দাবি জানিয়েছে। এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস গ্রহণের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও পিছিয়ে রয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষার্থীদের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকার কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

জানা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণার পর ২৯ মার্চ থেকেই মাধ্যমিক পর্যায়ের ক্লাস সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু হয়। পরবর্তীতে ৭ এপ্রিল থেকে প্রাথমিকের ক্লাসও টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হচ্ছে। যেসব শিক্ষার্থী কোন কারণে ক্লাস মিস করবে তাদের জন্য পুনঃপ্রচারের ব্যবস্থাও রয়েছে। আবার চাইলে শিক্ষার্থীরা ইউটিউবের মাধ্যমেও ক্লাসগুলো দেখতে পারবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠকের পর গত ৩ মে অধীভূক্ত ২ হাজার ২৬০টি কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য অনলাইনে ক্লাস গ্রহণের নির্দেশনা দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে- যে সব কলেজের অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তারা জরুরি ভিত্তিতে অনলাইন ক্লাস চালু করবে। যেসব কলেজ/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ক্লাস সুবিধা নেই, তাদেরকেও দ্রুত এই সুবিধার আওতায় আসতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরী করা মোবাইল অ্যাপস কিংবা জুম সফটওয়্যার ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. হারুন অর রশীদ বলেন, কলেজসমূহে যাতে সেশনজট না হয় এজন্য শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ঘরে বসে পরীক্ষার যাবতীয় প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠার পর যেন একের পর এক পরীক্ষা নেয়ার সকল প্রস্তুতি কলেজ ও শিক্ষার্থীদের থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সিংহভাগ কারিকুলাম শিক্ষার্থীকে তার নিজ উদ্যোগে সম্পন্ন করতে হয়। এই মহামারী চলাকালীন শিক্ষার্থীদের ধৈর্য্য ও দ্বায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে এবং নিজ নিজ বাড়িতে বসে তার কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠগ্রহণ করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও অনলাইন কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। ছুটি দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে সেশনজটে না পড়তে পরীক্ষা ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রস্তুতিনেয়ার জন্যে শিক্ষকদের কাজ করে যেতে হবে।

একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণে সমর্থ তারা কি পদ্ধতিতে তা গ্রহণ করবে তা আজকের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। যাদের সক্ষমতা নেই তাদেরকে ইউজিসি ও এটুআই এর সহযোগিতা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ি কোন বিশ্ববিদ্যালয় কি পদ্ধতিতে ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণ করবে তা ইউজিসিতে জমা দেবে। তবে আমাদের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অংশগ্রহণ করার মতো অবস্থায় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন প্রাথমিক-মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরাও অনলাইনে ক্লাস করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমস্যা হওয়ার কথা না। এছাড়া গ্রামে-গঞ্জে সব জায়গায় এখন ইন্টারনেটের সুবিধা রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যন্ত ফাইবার অপটিক্যালের সংযোগ রয়েছে। তারা চাইলে এই সুযোগও নিতে পারে। আর যাদের সমস্যা থাকবে তারা পরবর্তীতে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

যদিও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র/ছাত্রীদের জোরপূর্বক অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে দাবি করে তার প্রতিবাদে সকল ধরনের ক্লাস ও কার্যক্রম বয়কটের ডাক দিয়েছে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন। সম্প্রতি প্রাইভেট ইউনিভারসিটির শিক্ষার্থীদের পক্ষে নোকিব হোসেন রিদম এর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইনে কার্যক্রম চালানোর জন্য যে নোটিশ দেয়া হয়েছে, তার প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, অনেকের তো ভালো ইফতারেরই ব্যবস্থা হচ্ছে না, তারা কি পড়াশোনা করবে কিভাবে?
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন অনলাইনে ক্লাস-পরীক্ষার কথা চিন্তা করছে তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো ক্লাসের বিষয়ে কোন চিন্তা-ভাবনা করছে না। অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ইউজিসি অনলাইন ক্লাসের নির্দেশনা দিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে অনলাইন ক্লাস সম্ভবপর নয় বলে মত দেন তিনি।

করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতে এখনই অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে যাচ্ছে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে ঈদের পরে সংশ্লিষ্ট সকল দিক বিবেচনায় এনে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান।
সম্প্রতি একটি ভাচুয়াল মিটিংয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি করোনা সঙ্কটকালে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে সচল থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।সূত্রঃইনকিলাব