ইতিকাফ কী কেন ও এর ফজিলত

ইতিকাফ কী কেন ও এর ফজিলত

রমজানের সাথে অবশ্য-প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়, ইতিকাফ। ইতিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ, কোনো কিছুর সাথে নিজেকে সংযুক্ত করা, আবদ্ধ করা ইত্যাদি। পরিভাষায়, একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে কোনো পুরুষ নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলা এবং বাসস্থানের নির্জনতম জায়গায় কোনো মহিলা নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলাকে ইসলামী পরিভাষায় ইতিকাফ বলে।

ইসলামী শরীয়তে ইতিকাফের হুকুম :

কুরআন-সুন্নাহ এবং ইজমার ভিত্তিতে ইতিকাফকে ইসলামী শরীয়তের বিধানরূপেই গণ্য করা হয়।
কুরআনের দলিল হচ্ছে: “আমি ইব্রাহীম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।” (সূরা বাকারা, ১২৫)
“আর যতক্ষণ তোমরা ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে যৌনকর্ম করো না।” (সূরাবাকারা, ১৮৭)
এ সংক্রান্ত অনেক হাদিস রয়েছে। যেমন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরণ রমযান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর উম্মাহাতুল মুমীনিনগণও ইতিকাফ করেছেন।” (বুখারী, ২০২৬ ও মুসলিম, ১১৭২)
মূল হুকুম হচ্ছে, ইতিকাফ ফরয বা ওয়াজিব নয়; সুন্নত। তবে মান্নতের ইতিকাফ ওয়াজিব। আরবি বিশেষতঃরমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। যদি কোনো মসজিদে একজনও ইতিকাফে বসেন তাহলে এলাকাবাসী সুন্নত ছেড়ে দেওয়ার গোনাহ থেকে বেঁচে যাবেন। আর যদি একজনও ইতিকাফ না করে তাহলে ওই এলাকার সবাই গোনাহগার হবেন।

ইতিকাফের আবশ্যকীয় নীতিমালা:
১. ইতিকাফের পূর্বে নিয়ত করতে হবে।
২. পুরুষের জন্য জামে মসজিদ অর্থাৎ যে মসজিদে নিয়মিত জুমা হয় সে মসজিদেই ইতিকাফ করতে হবে।
৩. মহিলাদের জন্য বাসস্থানের একটি জায়গা নির্দিষ্ট করতে হবে, যত নির্জন হবে তত উত্তম।
৪. জুনুবী (গোসল ফরজের অবস্থা) অবস্থায় ইতিকাফ করা যাবেনা; মহিলাদের হায়েয-নিফাসের সময়ও ইতিকাফ নিষিদ্ধ।
৫. আর্থিক বাভিন্ন কোনো বিনিময়ের দ্বারা কাউকে ইতিকাফে বসালে তা শুদ্ধ হবেনা।
৬. রমযানের শেষ দশ দিনের জন্য কেউ ইতেকাফের ইচ্ছা পোষণ করলে তাকে একুশ রমযানের সাহরির সময় গত হবার পূর্বেই ইতিকাফের নির্ধারিত স্থানে নিয়তসহ ইতিকাফে বসে যেতে হবে; শেষ হবে শাওয়ালের চাঁদ উদয় হলে, ঈদের দিন সকালে ইতিকাফ থেকে উঠা উত্তম।
৭. নাবালেগ ছেলে-মেয়ের ইতিকাফ জায়েয।
৮. ইতিকাফকালীন স্বামী-স্ত্রীর সহবাস হারাম।

ইতিকাফকারীর জন্য যা বৈধ:

১. মসজিদে খাবার পৌঁছানোর কেউ না থাকলে খাবারের জন্য এবং মসজিদ-এটাস্ট বাথরুম না থাকলে বাথরুমের প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে।
২. অনিবার্য প্রয়োজনে বাহিরের কারো সাথে কথা বলা যাবে।
৩. আত্মীয়-স্বজনের কেউ দেখা করতে আসলে যত সংক্ষিপ্তে পারা যায়,কথা বলে তাকে বিদায় দেওয়া যাবে।

ইতিকাফকারীর জন্য যা অবৈধ:
.
১. অনিবার্য কারণ ব্যতীত বাহিরে যাওয়া।
২. বিনা-প্রয়োজনে কথা বলা।
৩. ইচ্ছাকৃতভাবে যৌন খেয়াল করা।
৪. জানাযায় শরিক হওয়া।
৫. সাধারণ গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া।

ইতিকাফের ফজিলত :

ইতিকাফের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিকাফের বহু ফজিলত বর্ণনা করেছেন।
১. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:যে ব্যক্তি রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করবে,সে যেন দু’টি হজ ও দু’টি ওমরা আদায় করল। (কাশফুল গুম্মাহ, প্রথম খ-) অত্র হাদিস শরীফ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রমজানের শেষ দশে ইতিকাফের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
২. হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: ইতিকাফকারী ইতিকাফের কারণে সর্বাবস্থায় গুনাহ থেকে বিরত থাকে এবং নেকীর এমন সওয়াব অর্জন করে থাকে যেন সমস্ত নেকীর সওয়াব সে অর্জন করে। (ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ)

আমাদের অন্যান্য ইবাদতের মতো ইতিকাফেও রিয়ার অনুপ্রবেশ লক্ষ্যণীয়। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে মোটেও ইবাদত করা যাবে না। আমাদের মনে রাখা উচিত, ইবাদতের মধ্যে যত এখলাস থাকে সে ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহর দরবারে তত বেড়ে যায়। তাই, আমাদের অবশ্যই উচিত, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে একনিষ্ঠতার সহিত ইতিকাফ করা।

সংবাদটি ফেসবুকে শেয়ার করুন