কার শরীরে কী জীবাণু আছে বুঝব কীভাবে’

কার শরীরে কী জীবাণু আছে বুঝব কীভাবে’

২৮ বছর ধরে লাশকাটা ঘরে আছি। কখনও মনে ভয় ধরেনি। তবে করোনা আসার পর ডাক্তার স্যারদের বলেছি, আগে নিজে বাঁচতে হবে। আবার কাজও করে যেতে হবে। গাউন (পিপিই) দেন স্যার। এরপর গাউনসহ সব সরঞ্জাম পেয়েছি। পুলিশ কেস হলেই লাশ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়। কোন লাশের ভেতর কী জীবাণু আছে বুঝব কীভাবে। দেখা গেল করোনা আক্রান্ত কেউ আত্মহত্যা করল বা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল, তার লাশও তো কাটতে হচ্ছে। মালিকের (সৃষ্টিকর্তা) নাম নিয়ে প্রথমেই লাশের মুখে ব্লিচিং পাউডার মেশানো গরম পানি ঢেলে দিই। তারপর কাপড় দিয়ে মুখটা ঢেকে রাখি প্রায় দুই ঘণ্টা। এভাবেই লাশ জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে।’ করোনার দিনগুলোতে লাশকাটা ঘরের এমন বর্ণনা তুলে ধরলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোম (মর্গ সহকারী) যতন কুমার। গতকাল শুক্রবার যতন কুমার সমকালকে আরও জানান, সবচেয়ে ঝুঁকি নিয়ে আমরাই কাজ করি। সরাসরি লাশে হাত দিতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও তিনটি লাশ কাটতে হয়েছে। এর মধ্যে একটি ছিল ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা নিহত এক ব্যক্তির। অন্য দুটি আত্মহত্যা করা।

লাশকাটা ঘরের বর্তমান চিত্র জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারী সেকান্দার আলী বললেন, ৩৪ বছর এই পেশায় আছি। নির্ভয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা তো এই দেশের নাগরিক। বিপদের দিনে ভয় পেলে তো চলবে না। যখন লাশ কাটা হয়, তখন একটি টিম থাকে। সেখানে চিকিৎসক থাকেন। তবে আমাদেরই বেশি সময় লাশের পাশে থাকতে হয়। কখনও কখনও এমনও মনে হয়- যেন লাশের কথা বুঝতে পারছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লাশকাটা ঘরেই থাকতে চাই।

সেকান্দার আলী আরও জানান, করোনা পরিস্থিতিতে নিজেদের সুরক্ষার কথা ভাবতে হচ্ছে। মর্গে চিকিৎসক ছাড়া তারা তিনজন স্টাফ রয়েছেন। এখানে ব্লিচিং পাউডার, গ্লাভস আর স্যাভলনের ব্যাপক সংকট। লাশ কাটার পর এসব দিয়ে ধোয়ামোছা না করলে ওই জায়গা জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব নয়। দ্রুত মর্গে ব্লিচিং পাউডারসহ এসব সামগ্রী সরবরাহ করা জরুরি।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোম শ্যামল লাল সমকালকে বলেন, ১৩ বছর ধরে লাশকাটা ঘরে আছি। এখনকার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। মনের অজান্তে হলেও একটু ভয় কাজ করে। আগে লাশের সঙ্গে পুলিশ, স্বজনসহ অনেক মানুষ আসতেন। এখন লোকজন কম আসেন। স্বজনরা এলেও দূরে দূরে থাকেন। বছরে প্রায় সাড়ে চারশ’ লাশ ওই মর্গে কাটা হয় বলে জানান তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সমকালকে বলেন, ঝুঁকি নিয়েই আমাদের লাশের ময়নাতদন্ত করতে হচ্ছে। সব লাশের তো করোনা টেস্ট হয় না। আমরা কীভাবে বুঝব কে করোনা জীবাণুবাহী ছিল আর কে ছিল না। লাশকাটা ঘরে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করা জরুরি। এখনও এ ধরনের মাস্ক আমরা পাইনি। আমরা সাধারণত মৃতদেহের ফুসফুস ও শ্বাসনালি কেটে থাকি। করোনার জীবাণু ওই দুই জায়গায় বেশি থাকে। মানব শরীরে যে অংশে করোনার বেশি বসবাস, সেখানকার ক্লোজ কন্টাক্টে আমাদের যেতে হয়। তাই লাশ কাটার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের শতভাগ সুরক্ষা সামগ্রী থাকা জরুরি।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. মাকসুদুর রহমান বলেন, সরকার এখন পর্যন্ত যেসব সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েছে তা ব্যবহার করেই কাজ করে যাচ্ছি। মর্গের সবাইকেই পিপিই দেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি ফেসবুকে শেয়ার করুন




Do NOT follow this link or you will be banned from the site!